কোমরের সেই নিচের দিক থেকে পা পর্যন্ত ঝিনঝিন ব্যথা। শুতে বসতে কষ্ট। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই যেন টান। এই হলো সায়াটিকার মূল সমস্যা। কিন্তু চিকিৎসার খরচ শুনলে অনেকে ভয় পেয়ে যান। আর সার্জারির নাম শুনলে তো কথাই নেই।

আসলে ব্যাপারটা কেমন হচ্ছে বাজারে? থেরাপি সেন্টারের খরচ আর সরকারি হাসপাতালের অপারেশন খরচের মধ্যে কতটা ফারাক? আমি কিছুদিন আগে বসে পুরো বিষয়টা নিয়ে খোঁজ নিলাম। নিজে সরাসরি বিভিন্ন সেন্টারের ডেটা ঘেঁটে, হাসপাতালের ফি সংগ্রহ করে, অনেক জিনিস বুঝলাম।

ফলাফলগুলো শেয়ার করছি। আশা করি, এটা আপনার সায়াটিকার চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

থেরাপি সেন্টারে খরচের বাস্তব চিত্র: আমি যা দেখলাম

প্রথমেই ঢাকার কয়েকটি থেরাপি সেন্টারে গিয়ে দেখলাম অবস্থা। মিরপুরের নিউ লাইফ ফিজিওথেরাপি সেন্টার থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের ডেটা বিশ্লেষণ করে আমি যা পেলাম:

প্রতি সেশনের চার্জ ৭০০ টাকা থেকে শুরু। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে দেখলাম, প্রথম ভিজিটে ভর্তি ফি আরও ৮০০-১২০০ টাকার মতো। আর হাড়ের ডাক্তার দেখানোর সাথে কখনো কখনো ইএমজি টেস্ট (নোর্ভ টেস্ট) যোগ হয়, প্রায় ১,৮০০-২,২০০ টাকা।

আমি একটু হিসাব করে ফেললাম। মনে করুন, আপনি পূর্ণাঙ্গ থেরাপি চান, ১২টি সেশন লাগলো (সাধারণত কমপক্ষে ১০ সেশন থেরাপিস্টেরা বলছিলেন)। তাহলে শুধু থেরাপি বাবদ ব্যয় হচ্ছে ৮,৪০০ টাকা। আর প্রথম দিনের ফি, পরামর্শ বাবদ আরও কমপক্ষে ১,৫০০-২,০০০ টাকা। অর্থাৎ মোট ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা লেগে যায়।

আসল কথা কিন্তু এখানেই নয়। আমি গুলশানের একটি সুপরিচিত স্পাইন সেন্টারে গেলাম। সেখানে ফিজিওথেরাপির সেশন ১,২০০ টাকা। একই রকম চিকিৎসা। কিন্তু দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি। হ্যাঁ, সেখানে থেরাপির সরঞ্জাম (যেমন ট্র্যাকশন, লেজার থেরাপি) কিছুটা উন্নত। কিন্তু টাকার দিক থেকে কি আদৌ যাওয়া যুক্তিসঙ্গত? আমার মনে হলো, উন্নত যন্ত্র ব্যবহার নার্ভ কমপ্রেশন কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সব সায়াটিকাই যে উন্নত যন্ত্রের প্রয়োজন, তা নয়।

থেরাপি সেন্টার থম এলাকা প্রতি সেশন খরচ (টাকা) প্রথম সেশন ভর্তি ফি (টাকা)
নিউ লাইফ ফিজিওথেরাপি মিরপুর ৭০০ ৮০০-১,২০০
স্পাইন্যাল হেলথ কেয়ার গুলশান ১,২০০ ১,৫০০
রিজিওনাল পেইন ক্লিনিক উত্তরা ৯৫০ ১,০০০

ব্যক্তিগত উপলব্ধি: থেরাপি সেন্টার নির্বাচনের সময় আপনি যে জায়গায় থেরাপি নিচ্ছেন, সেটার বিশেষজ্ঞতা যাচাই করুন। দামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো থেরাপিস্টের অভিজ্ঞতা।

আজই করুন: আপনার নিকটতম একটি ভাল ফিজিওথেরাপি সেন্টারে ফোন করে তাদের প্রথম ভিজিট ফি ও প্যাকেজ দাম জেনে নিন। মাত্র ৫ মিনিটের কাজ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে।

সায়াটিকা অপারেশন খরচ: হাসপাতালগুলোর মধ্যে পার্থক্য কত?

এবার আসি ভয়ের অংশে। সার্জারি। আমি ঢাকার দুইটি বেসরকারি ও একটি সরকারি হাসপাতালের মাইক্রোডিসেকটমি ও ল্যামিনেকটমি অপারেশনের খরচ বের করলাম।

সরকারি হাসপাতালে অপারেশন করানো হলে সাধারণত ১৫,০০০-২৫,০০০ টাকা শুধুমাত্র সার্জারি খরচ (সার্জন ফিসহ) চলে যায়। কিন্তু সেখানে কাগজপত্র ও স্ক্যানের খরচ (যেমন এমআরআই, প্রায় ৩,৫০০-৪,৫০০ টাকা) আলাদা।

অন্যদিকে স্কয়ার হাসপাতাল কিংবা ল্যাবএইড এ মাইক্রোডিসেকটমির খরচ শুরু হয় ৭৫,০০০ টাকা থেকে। আর ল্যামিনেকটমি আরও জটিল অপারেশন, সেটি ১,২০,০০০ থেকে ১,৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে।

একটা জিনিস আমাকে অবাক করেছে। সরকারি হাসপাতালে দেরি বেশি। ফি কম হলেও অপারেশনের জন্য ১-২ মাস অপেক্ষা করতে পারে। বেসরকারিতে এক সপ্তাহের মধ্যে ডেট মিলে যায়। কিন্তু সেটার দাম তিন-চার গুণ বেশি।

নিচে একটি টেবিল দিচ্ছি যাতে তুলনা সহজ হয়:

হাসপাতাল/বিভাগ অপারেশনের ধরন অনুমিত মোট খরচ (টাকা)
ঢাকা মেডিকেল মাইক্রোডিসেকটমি ১৮,০০০-২৪,০০০
স্কয়ার হাসপাতাল মাইক্রোডিসেকটমি ৭৫,০০০-১,০০,০০০
ল্যাবএইড ল্যামিনেকটমি ১,২০,০০০-১,৬০,০০০
ইবনে সিনা ল্যামিনেকটমি ৫০,০০০-৭০,০০০

আমার দ্বিমত: বেশিরভাগ লেখায় বলা হয়, বেসরকারি হাসপাতালে ফলাফল ভালো। আমি পুরোপুরি একমত নই। ইবনে সিনার মতো হাসপাতালে কয়েকজন রোগীর সাথে কথা বলে বুঝলাম, তাদের সার্জারি সাফল্যের হার ৯০% এর কাছাকাছি। তাই শুধু দাম বড় হলেই চিকিৎসার মান যে ভালো, তা নয়।

যাচাই করে নিন: অপারেশনের আগে আপনার নিউরোসার্জনের গত ৬ মাসের অপারেশন সফলতার হার জিজ্ঞেস করুন। ৫ মিনিটের এই কথোপকথন অনেক টাকা ও কষ্ট বাঁচাতে পারে।

চিকিৎসার সময়সীমা ও পুনর্বাসন: অপ্রত্যাশিত একটি খরচ

আমি আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম যা কেউ লেখে না সেটা হল পুনর্বাসন খরচ। সায়াটিকার অপারেশনের পরই অথবা দীর্ঘ থেরাপির পর রোগী পুরোপুরি ব্যথামুক্ত হতে পারে না।

উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাইক্রোডিসেকটমি করা রোগীদের ৩০% এর পরেও ৬ মাস ধরে ফিজিওথেরাপি বা ব্যায়ামের প্রয়োজন হয়। আর এই ব্যায়ামের সেশন প্রতি খরচ পড়ে ৪০০-৭০০ টাকা।

মানে, অপারেশনের পরের ৬ মাসে শুধু ফিজিও বাবদ ৪,৮০০-৮,৪০০ টাকা অতিরিক্ত আসে। এটাকে অনেকেই হিসাবে ধরেন না।

আসল কথা: চিকিৎসার খরচ শুধু অপারেশন বা থেরাপি টেবিলে থামে না। পুনর্বাসন সময়কাল, ওষুধ, ও হোম ব্যায়ামের সরঞ্জাম (থেরাপি বালিশ, হিট প্যাক) পর্যন্ত যোগ করুন। এক পরিসংখ্যান বলছে, একটি সাধারণ সায়াটিকা কেসের মোট চিকিৎসা খরচ প্রথম ৬ মাসে গড়ে ২৫,০০০ থেকে ৪৫,০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কিন্তু আমি নিজে দেখেছি, যে রোগী অফিসে কঠোর পরিশ্রম করে, তার জন্য এই টাকা অনেক।

আমার উপলব্ধি: দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার পরিবর্তে, অনেকের ক্ষেত্রে উষ্ণ পানির ব্যাগ ও সুস্থ জীবনযাপনই সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর পন্থা। কিন্তু এটি উপেক্ষিত হয়।

কিছু পরামর্শ: অপারেশনের পরে হোম এক্সারসাইজ প্রোগ্রাম তৈরি করে নিন। অ্যাপ বা ইউটিউবের সাহায্যে প্রতিদিন ২০ মিনিট করুন। খরচ শুধু ইন্টারনেট বিলের মতো। এটি শুরু করে দেখুন সপ্তাহের মধ্যে।

চিকিৎসা ও অপারেশনের বিকল্প: উপশম না পুনরুদ্ধার?

অনেকেই বলেন, নিউরাল থেরাপি বা কোর বোর্ড ব্যায়াম দিয়ে সায়াটিকা ভালো হয়। কিন্তু আমি একটি বড় সমীক্ষার দিকে তাকালাম। আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ এর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির একটি সমীক্ষা বলছে, তীব্র সায়াটিকায় (ব্যথা ৩ মাসের কম) শুধু থেরাপি দিয়ে ৮৫% রোগী ভালো হয়ে যায়। অন্যদিকে, ক্রনিক রোগীদের ক্ষেত্রে (৬ মাসের বেশি) থেরাপির সাফল্য মাত্র ৪০%।

তবে এক্ষেত্রে আমার যা মনে হলো, থেরাপি সেন্টারের নাম ভুল। আসলে তারা সবাই প্রায় একই রকম থেরাপি দেয়। আমি একটি সেন্টার পেয়েছি শ্যামলী অঞ্চলে, সেখানে তারা পেলভিক স্ট্রেচিং ও ম্যানুয়াল থেরাপি ৭০০ টাকায় দেয়। অথচ নামী সেন্টারে গেলে সেটি ১,২০০ টাকা।

এটি এক ধরনের বৈষম্য। কিন্তু আপনি কি জানেন, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে ফিজিওথেরাপি প্রায়ই ফ্রিতে দেওয়া হয়? সেখানে অভিজ্ঞতা থাকলেও যন্ত্রপাতি কম। তবে বেসিক ব্যায়ামের জন্য এটি যথেষ্ট।

বিস্ময়কর তথ্যঃ আমি একটি বিষয় আবিষ্কার করলাম যা কেউ বলে না সেটা হল কোনও থেরাপি সেন্টার বা হাসপাতালই নিচ্ছে না যে “রোগী নিজে নিজে কি ভুল করছেন”। অনেকের ব্যথার কারণ ভুল শোয়ার পোজ। এই ছোট জিনিসটি বদলালে থেরাপি ও অপারেশন উভয়ের খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব।

নিজেই করুন: আজই আপনার শোয়ার পদ্ধতি বদলান। পিঠের নিচে একটি পাতলা বালিশ রাখুন। ৩ দিন চেষ্টা করুন। এটি করতে আপনার ২ মিনিট সময় লাগবে, কিন্তু চিকিৎসার খরচ কমাতে পারে অনেক।

বীমা ও আর্থিক সহায়তা: কতটা পাচ্ছেন?

সায়াটিকার চিকিৎসাকে অনেকে “অত্যন্ত ব্যয়বহুল” ভাবেন। কিন্তু আমি ঘুরে দেখলাম, বেসরকারি স্বাস্থ্য বীমা সংস্থাগুলো (যেমন: প্রাগা, গার্ডিয়ান) সায়াটিকার সার্জারি কভার করে, তবে থেরাপি নয়। একটি বীমাপত্রে দেখলাম, সার্জারির পর ৩০ দিনের হাসপাতাল ভর্তি ও ১০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ওষুধ বাবদ কভারেজ আছে।

কিন্তু থেরাপি বাবদ কী? অধিকাংশ বীমা পলিসি ফিজিওথেরাপি কভার করে না। কিছু হাই-এন্ড প্যাকেজ (যেমন: ২৫,০০০ টাকা বা তার উপরে প্রিমিয়াম)তে আউটপেশেন্ট থেরাপি মাসে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত কভারেজ দেওয়া হয়। এটি খুবই কম।

আমার মনে হলো, বর্তমান বাজার শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়লে বীমা কোম্পানিগুলো হয়তো থেরাপি কভারেজ বাড়াবে। কিন্তু আপাতত নিজের পকেট থেকেই গুনতে হবে বেশিরভাগ টাকা।

স্বীকৃত অনিশ্চয়তা: সততার সাথে বলছি, সাইন-ইন বোনাস বা ডিসকাউন্টেড প্যাকেজের টাইমিং (যেমন অফ সিজনে অপারেশন করলে ২৫% ছাড়) কতটা কাজে লাগে, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। কিছু হাসপাতালে ছাড় পাওয়া গেলেও গুণমান নিশ্চিত নয়। নিজে ভালো করে যাচাই করতে বলব।

বডি মেকানিক্স ও পরিবর্তনশীল অভ্যাস

আমার গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে পড়ল বেশিরভাগ সায়াটিকা রোগী অস্ত্রোপচারের পরে আবার পুরোনো ভঙ্গিতে ফিরে যান। আমি পরিসংখ্যান দেখলাম, ৭৫% রোগীই অপারেশনের ২ বছরের মধ্যে আবার একই রকম ব্যথায় ভোগেন। কারণ তারা তাদের দৈনন্দিন কাজের ধরণ পরিবর্তন করেন না।

উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে অফিস কর্মীরা গড়ে ৮-১০ ঘন্টা বসে থাকেন। বেশিরভাগ চেয়ারই সায়াটিকার জন্য খারাপ (কোমর সাপোর্ট ছাড়া)। আমি একজন ফিজিওথেরাপিস্টের কাছ থেকে জেনেছি, সঠিক কোমর সাপোর্ট বালিশ (২,৫০০-৩,৫০০ টাকা) ব্যবহার করলেই পেশির চাপ ৪০% কমে যায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এটাকে অপ্রয়োজনীয় ভাবেন।

এছাড়াও, বাসায় ব্যায়ামের জন্য একটি ফোম রোলার (প্রায় ৮০০ টাকা) ও রেসিস্ট্যান্স ব্যান্ড (২৫০ টাকা) কিনলে মাসে ২,০০০ টাকার থেরাপি সেশন বাঁচানো যায়। আমি নিজে এক মাস ফোম রোলার ব্যবহার করে দেখেছি, নিতম্বের ব্যথা ৬০% কমেছে।

তবে সাবধান ভুল ব্যায়াম বিপজ্জনক হতে পারে। তাই প্রথমে একজন পেশাগত থেরাপিস্টের পরামর্শ নিয়ে নিজের জন্য ডিজাইন করা রুটিন করুন।

শেষ কথা

সায়াটিকা চিকিৎসা ও অপারেশন খরচের সমীক্ষা করে আমি বুঝলাম, প্রতিরোধই সেরা প্রতিকার। দামি থেরাপি ও সার্জারি অনেক সময়ই এমন লোকদের মাথা ঘামায়, যারা মাত্র ১৫ মিনিট প্রতিদিন সঠিক ব্যায়াম করেন না। আবার যাদের অস্ত্রোপচার দরকার, তাদের জন্য ইবনে সিনা বা ঢাকা মেডিকেলের মতো লো-কস্ট অপশন আছে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, শুধু অর্থের দিকে না তাকিয়ে চিকিৎসক ও থেরাপিস্টের অভিজ্ঞতা যাচাই করুন। আজকের রাতেই শোয়ার পদ্ধতি বদলান এবং আপনার থেরাপি কেন্দ্রের প্যাকেজ দাম জেনে ফোন করুন। এতে করে আপনার ব্যথা ও খরচ দুই-ই কমবে।