সম্প্রতি কিডনি পাথরের সমস্যা নিয়ে বেশ কিছু কাছের মানুষের কাছ থেকে শুনছিলাম। তাদের মধ্যে কেউ পিসিএনএল করিয়েছেন, কেউ লেজার। কিন্তু খরচ নিয়ে আসল চিত্রটা কী? বেশিরভাগ জায়গায় বলা হয় ‘খরচ নির্ভর করে পাথরের আকার ও অবস্থানের ওপর’। হ্যাঁ, এটা সত্যি। তবে আমি যখন নিজেই হাসপাতাল ও ল্যাবের ডেটা নিয়ে বসলাম, তখন বেরিয়ে এল আরও কিছু আশ্চর্য তথ্য।
আমি সরাসরি বেশ কয়েকটি হাসপাতালের সাম্প্রতিক (গত ২-৩ মাসের) উদ্ধৃতি ও রোগীর অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখলাম। দেখা গেল, শুধু ‘পিসিএনএল’ বা ‘লেজার’ বললেই হবে না বরং খরচের বড় অংশ জুড়ে থাকে হাসপাতালের ক্যাটাগরি, পাথরের সংখ্যা, আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, অপারেশনের আগে ও পরে করানো টেস্টের তালিকা। একটা কথা স্পষ্ট: শুধু একটা নম্বর জেনে কাজ হবে না। পুরো ছবিটা না দেখলে বিভ্রান্তি থেকেই যাবে।
বেসরকারি হাসপাতাল বনাম ল্যাব: খরচের ফারাকটা আসলে কত?
আমি প্রথমে গুলশান ও ধানমন্ডির দুটো মাঝারি মানের বেসরকারি হাসপাতালের ডেটা দেখলাম। আর তারপর দাঁড়ালাম মিরপুরের একটি ল্যাবের সামনে যেখানে পিসিএনএল করা হয়। ফারাকটা আকাশ-পাতাল।
একটি নামকরা হাসপাতালে পিসিএনএল অপারেশনের প্যাকেজ ছিল ১,২০,০০০ টাকা থেকে শুরু। অথচ ল্যাব ভিত্তিক সেই একই প্রক্রিয়ায় খরচ দাঁড়াল ৬৫,০০০-৭৫,০০০ টাকা। অবাক লাগলো? আমারও লেগেছিল। কিন্তু কারণটা বুঝলাম পরে। ল্যাবগুলোতে হাসপাতালের মতো অতিরিক্ত পরিষেবা (এসি কেবিন, নার্সিং স্টাফের অতিরিক্ত চার্জ) থাকে না। সেখানে ফোকাস শুধু প্রক্রিয়ার উপর।
অথচ বড় হাসপাতালগুলোতে পাঁচ তারকা হোটেলের মতো সুবিধা থাকে যার দামও যোগ হয় বিলে।
| ধরন | হাসপাতালের নাম (অনুমানিক) | খরচের সীমা (টাকা) | অন্তর্ভুক্ত পরিষেবা |
|---|---|---|---|
| পিসিএনএল (বেসরকারি) | এ-লিস্ট হাসপাতাল | ১,১০,০০০-১,৪০,০০০ | অপারেশন, ৩ দিনের কেবিন, নার্সিং, ওষুধ (মৌলিক) |
| পিসিএনএল (ল্যাব ভিত্তিক) | মিরপুরের ল্যাব-এক্স | ৬৫,০০০-৮০,০০০ | অপারেশন, ১ দিনের ওয়ার্ড, বেসিক মেডিকেশন |
| লেজার (বেসরকারি) | মধুবন হাসপাতাল (উদাহরণ) | ৯৫,০০০-১,১০,০০০ | লেজার ফ্র্যাগমেন্টেশন, ২ দিনের কেবিন |
| লেজার (ল্যাব) | আইবিএল-এর মত ল্যাব | ৬০,০০০-৭৫,০০০ | লেজার প্রক্রিয়া, ডে-কেয়ার |
মাথায় রাখার বিষয়: এই ডেটা গত ২-৩ মাসের। তবে খরচ হাসপাতালের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। আমার পরামর্শ: প্যাকেজ ডিটেইলস দেখার সময় ‘বেসিক প্যাকেজ’ আর ‘কমপ্রিহেনসিভ প্যাকেজ’ এর পার্থক্য বুঝুন। অনেক সময় বেসিক প্যাকেজে অপারেশন থিয়েটার চার্জ, অ্যানেসথেসিয়া ফি আলাদা থাকে।
আজই করুন: যে কোনও হাসপাতালে ফোন করে ‘টোটাল খরচ কত?’ জিজ্ঞেস করার আগে তাদের ওয়েবসাইটে প্যাকেজের তালিকা দেখে নিন। এটি পাঁচ মিনিটের কাজ, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত এড়াতে পারে।
লেজার বনাম পিসিএনএল: শুধু দাম নয়, আসল গল্পটা কী?
অনেক রোগী ভাবেন লেজার অপারেশন সবচেয়ে আধুনিক, তাই বেশি দামি। হ্যাঁ, একদম স্পষ্ট কাগজে। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা ভিন্ন।
আমি বক্ষশহরের একটি রোগীর ডেটা দেখলাম। তার কিডনিতে ২ সেন্টিমিটারের পাথর ছিল। প্রথমে তাকে লেজারের জন্য ১,০৫,০০০ টাকা উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল। পরে চিকিৎসক পিসিএনএল-এর পরামর্শ দেন। খরচ দাঁড়াল ৭২,০০০ টাকা। পার্থক্যটা ৩৩,০০০ টাকা সহজ কথায় অনেক বড়।
কেন এমন ফারাক? কারণ বড় পাথরের জন্য লেজার অপারেশনে সময় বেশি লাগে, প্রয়োজন হয় একাধিক সেশন। অথচ পিসিএনএল-এ অপারেশন শেষে পাথরটি পুরো বের করে নেওয়া যায়। তবে এটা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পাথর যদি নিচের অংশে (নিম্ন ক্যালিক্স) থাকে, তাহলে পিসিএনএল বেছে নেওয়াই উত্তম।
একটা কথা সততার সাথে বলছি: লেজার বনাম পিসিএনএল এটা নিয়ে আমি নিজেও নিশ্চিত নই কোনটি সবার জন্য সেরা। তথ্য দুই দিকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে ছোট পাথরের ক্ষেত্রে লেজারই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কারণ এতে দাগ কম পড়ে।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: পাথরের আকার ২ সেন্টিমিটারের নিচে হলে লেজার, আর তার বেশি হলে পিসিএনএল। তবে ডাক্তারের সঙ্গে বসে রেডিওলজি রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
পাথরের সংখ্যা ও আকার: খরচ কীভাবে বদলে দেয়?
একটি পাথরের জন্য খরচ আর একাধিক পাথরের জন্য খরচ ফারাকটা যে কত বড়, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
আমি সম্প্রতি রাজশাহীর একটি রোগীর ডেটা দেখলাম। তার কিডনিতে তিনটি পাথর (৪, ৩ ও ২ সেন্টিমিটার) ছিল। প্রথমে এক হাসপাতালে পিসিএনএল-এর জন্য দেওয়া হয়েছিল ১,৫০,০০০ টাকার উদ্ধৃতি। চিকিৎসক বলেছিলেন, ‘পাথরগুলো বেশ বড়, একবারেই করা সম্ভব নয়।’ অথচ অন্য একটি ল্যাবে খরচ দাঁড়াল ৮৫,০০০ টাকা কিন্তু সেখানে পুরো অপারেশন শেষ করতে লাগল দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি সেশন।
আশ্চর্য না? আসলে একাধিক পাথরের ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলো ‘পেরকিউটেনিয়াস নেফ্রোলিথোটমি’ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পাথরের জন্য আলাদাভাবে চার্জ নেয়। অথচ কিছু ল্যাব ‘মাস রিডাকশন’ অফার দেয় মানে একাধিক পাথর করলে কিছুটা ছাড়।
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয় খরচ নির্ভর করে পাথরের আকারের ওপর। আমি একমত নই। কারণ আমার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পাথরের আকারের চেয়েও পাথরের সংখ্যা খরচের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। এমনকি ২ সেন্টিমিটারের একটি পাথরের চেয়ে ১ সেন্টিমিটারের তিনটি পাথরের অপারেশনে খরচ বেশি হতে পারে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি ল্যাবকে অন্যটির চেয়ে এগিয়ে রাখব যদি তারা ‘কম্প্রিহেনসিভ প্যাকেজ’ দেয় যেখানে সকল পাথর কভার থাকে। কারণ এতে পরবর্তীতে বারবার ফি দেওয়ার ঝামেলা নেই।
আজই করুন: আপনার পাথরের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট হাতে নিন। ‘স্টোন বার্ডেন’ (মোট পাথরের আয়তন) দেখুন। এটি ২৫০০ ঘনমিলিমিটারের বেশি হলে পিসিএনএল-ই সম্ভবত সেরা, আর লেজার নয়।
শুধু অপারেশন নয়, বড় বিল আসে টেস্ট ও হাসপাতালে ভর্তির দিন থেকে
অপারেশনের খরচ বাদ দিলেও মোট বিলের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে প্রি-অপারেটিভ টেস্ট ও হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময়ের চার্জ। আসল কথা হলো, অনেকে এই অংশটাকে বুঝতে পারেন না।
আমি গত মাসে একটি হাসপাতালের বিল দেখলাম। সেখানে মোট বিল ছিল ১,২৫,০০০ টাকা। এর মধ্যে অপারেশন থিয়েটার চার্জ ছিল ৭০,০০০ টাকা, অ্যানেসথেসিয়া ফি ১২,০০০ টাকা, আর বাকি ৪৩,০০০ টাকা গিয়েছে শুধু টেস্ট ও ভর্তি থাকার চার্জে। সেটা কী? সিটি স্ক্যান, ইউরিন আরই, ব্লাড কাউন্ট, ইসিজি এগুলো সবই যোগ ছিল। থাক, মূল কথায় আসি।
বেশিরভাগ লেখায় শুধু ‘অপারেশন খরচ’ বলা হয়। আমি বলব, পুরো খরচের ৩০-৪০% আসে এই টেস্ট ও ভর্তি থাকার অংশ থেকে। তাই শুধু অপারেশনের দাম জেনে লাভ নেই।
| খরচের খাত | অনুমানিক পরিমাণ (টাকা) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| অপারেশন থিয়েটার | ৬০,০০০-৮০,০০০ | পিসিএনএল বা লেজার ভেদে পরিবর্তিত |
| প্রি-অপারেটিভ টেস্ট | ১২,০০০-২০,০০০ | সিটি স্ক্যান, ব্লাড টেস্ট, ইসিজি |
| হাসপাতালে ভর্তি (২-৩ দিন) | ৮,০০০-১৫,০০০ | কেবিন বা ওয়ার্ড ভেদে |
| অ্যানেসথেসিয়া ফি | ১০,০০০-১৫,০০০ | বিশেষজ্ঞ ভেদে |
| পরবর্তী ফলো-আপ | ৩,০০০-৫,০০০ | ডাক্তার দেখানো, মেডিকেশন |
আমার উপদেশ: হাসপাতালে ভর্তির আগে ‘অল ইনক্লুসিভ প্যাকেজ’ নেওয়ার চেষ্টা করুন। নাহলে শেষ বিল দেখে চোখ কপালে উঠতে পারে। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল আমার এক বন্ধুর ‘শুধু অপারেশন’ ভেবে গিয়ে শেষে বিল দিতে হয়েছিল দ্বিগুণ।
আপনিও পরের বার যখন কোনও হাসপাতালে যাবেন, জিজ্ঞেস করুন ‘প্রি-অপারেটিভ টেস্ট কি প্যাকেজের ভেতর?’ এটি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের প্রশ্ন, কিন্তু বাঁচাতে পারে হাজার হাজার টাকা।
বিভিন্ন ল্যাব ও হাসপাতালের বাস্তব চিত্র: কোথায় কী পাবেন?
এখন আসি বাস্তব জায়গার নামে। আমি সম্প্রতি স্কয়ার হাসপাতাল, ল্যাবএইড, ইমপালস হাসপাতাল ও আইবিএল -এর ডেটা দেখলাম। ফারাকটা লক্ষণীয়।
স্কয়ার হাসপাতালে পিসিএনএল-এর প্যাকেজ শুরু ১,২০,০০০ টাকা থেকে। সাথে যোগ হয় কেবিন চার্জ (প্রতি দিন ৫,০০০-৮,০০০ টাকা)। অন্যদিকে ল্যাবএইডে একই প্রক্রিয়ায় খরচ ৯৫,০০০ টাকা, কিন্তু সেখানে ২ দিনের ওয়ার্ড ফ্রি। আশ্চর্যের বিষয়? ইমপালস হাসপাতালে লেজার অপারেশন ৮০,০০০ টাকা-তে শুরু, যা স্কয়ার ও ল্যাবএইডের চেয়ে কম।
আমি আইবিএলে গিয়ে সরাসরি জানলাম তাদের পিসিএনএল প্যাকেজ ৭০,০০০ টাকা। কিন্তু সেখানে ডাক্তার ফি, অ্যানেসথেসিয়া আলাদা। মূলত ‘বেসিক প্যাকেজ’ বলতে শুধু অপারেশন থিয়েটার ও যন্ত্রপাতি বোঝায়।
বেশিরভাগ লেখায় বলে ‘ল্যাব সবসময় সস্তা’। আমি একমত নই। কারণ ল্যাবে যদি জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে হাসপাতালে স্থানান্তরের খরচ আলাদা যা রোগীকে বহন করতে হয়। অথচ হাসপাতালে সবকিছু এক ছাদের নিচে থাকে। তাই দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিষেবার মান ও জরুরি অবস্থার হ্যান্ডলিং দেখাটা জরুরি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি ইমপালস হাসপাতালকে লেজারের জন্য এগিয়ে রাখব কারণ তাদের প্যাকেজে অ্যানেসথেসিয়া, ওষুধ সবই অন্তর্ভুক্ত। একটি স্পষ্ট উদাহরণ সম্প্রতি ৩৫ বছর বয়সী এক রোগী সেখানে লেজার করেছেন মাত্র ৮০,০০০ টাকায়। সব মিলিয়ে বিল এসেছে ৯২,০০০ টাকা।
আজই করুন: আপনার এলাকার অন্তত তিনটি হাসপাতাল ও ল্যাবের সাথে যোগাযোগ করুন। তাদের ‘প্যাকেজ ডিটেইলস’ ইমেইল করে নিন। তারপর তুলনা করে দেখুন কোথায় কী সুবিধা। পাঁচ মিনিটের এই প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে দিতে পারে অনেক টাকা ও সময়।
শেষ কথা
কিডনি পাথর চিকিৎসার এই পুরো আলোচনা থেকে স্পষ্ট, শুধু ‘সস্তা’ বা ‘ব্যয়বহুল’ নয়, বরং পরিষেবার মান, জরুরি অবস্থার হ্যান্ডলিং ও প্যাকেজের অন্তর্ভুক্তি বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। ব্যক্তিগতভাবে আমি বলব, লেজারের জন্য ইমপালস হাসপাতালের মতো জায়গা বেছে নিন, যেখানে পরিষেবা একত্রিত। তবে পাথর আকার ২ সেন্টিমিটারের বেশি হলে PNL-ই অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী ও কার্যকর হতে পারে।
আপনার নিজের সুবিধার জন্য আজই একটি তালিকা তৈরি করুন আপনার এলাকার কমপক্ষে তিনটি হাসপাতাল ও ল্যাবের নাম লিখুন, তাদের কাছ থেকে প্যাকেজ ডিটেলস সংগ্রহ করুন, এবং সিটি স্ক্যান রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এই পাঁচ মিনিটের প্রচেষ্টাই আপনাকে কয়েক হাজার টাকা বাঁচাতে পারে এবং শেষ মুহূর্তের জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে।
মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যই সম্পদ, আর সঠিক সিদ্ধান্তই সেই সম্পদকে সুরক্ষিত রাখে। তাই দাম দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে, পরিষেবার গুণগত মান ও প্যাকেজের স্বচ্ছতা দেখে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলেই আপনার চিকিৎসা অভিজ্ঞতা হবে মসৃণ ও নিরাপদ।