চোখের সমস্যা নিয়ে যখন কেউ হাসপাতালে যায়, তখন প্রথম প্রশ্নটা সাধারণত থাকে “কত খরচ হবে?” বিশেষ করে রেটিনার সমস্যা। এই জিনিসটা নিয়ে মানুষের মনে নানা ভীতি কাজ করে। শুধু রোগ নয়, বরং সেইসঙ্গে খরচের চিন্তা। আমি সম্প্রতি কিছু তথ্য ঘেঁটে দেখলাম। আর যা পেলাম, সেটা আমার নিজের বেশ কয়েকটা ধারণা বদলে দিল। আসুন, গভীরে যাই।

বেসরকারি হাসপাতালে রেটিনা অপারেশনের খরচ: আমি যা দেখলাম

ঢাকার নাম করা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর দাম হাঁকানোর ব্যাপারে কমবেশি সবারই ধারণা আছে। কিন্তু রেটিনা অপারেশনের বেলায় সংখ্যাটা দেখে আমি সত্যিই অবাক হলাম। আমি কয়েকটা সূত্র ঘেঁটে যা পেলাম, তাতে দেখা গেল একটি সাধারণ ভিট্রেক্টমি (যাকে বলে Vitrectomy) অপারেশনের জন্য খরচ পড়তে পারে ৭০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত।

এই পরিসংখ্যান শুনে অনেকে ভাববেন, “বেশিরভাগ জায়গায় তো কম বলা হয়।” আমি একমত নই। কারণ, আমি কয়েকটা নির্দিষ্ট কেস দেখলাম। যেমন ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে একজন রোগীকে বলা হয়েছিল প্রাথমিক বিল ৯০,০০০ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওষুধ, সিরিয়াল কেয়ার ও লেজার চিকিৎসার খরচ মিলিয়ে বিল দাঁড়ায় ১,৪০,০০০ টাকায়।

হাসপাতালের নাম বলি? একটি নামী হাসপাতাল, যাদের আই রেটিনা ডিপার্টমেন্টে দেশের সেরা চিকিৎসকরা কাজ করেন। উটপাড়া খুশিরাম? না, ঠিকই পড়েছেন। এইসব জায়গায় প্রকৃত খরচ প্রায়ই আগে বলা হয় না। আমি যা পেলাম, তা হলো অপারেশন থিয়েটারের খরচ ছাড়াও রয়েছে এনেস্থেশিয়া ফি, বিশেষ সিরিঞ্জ ও সিলিকন অয়েলের মতো সরঞ্জামের মূল্য।

আসুন, স্পষ্ট করে বলি। একটি সিলিকন অয়েলের দাম ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর বিশেষ গ্যাসের জন্য চার্জ পড়ে আরও ১০,০০০-১৫,০০০ টাকা। এই জিনিসটা কেউ কেউ বলে না। কিন্তু রোগী শেষে বিল পেয়ে কষ্ট পান।

“আমি নিজে একজন রোগীকে দেখেছি, যিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রতিষ্ঠানে রেটিনা অপারেশন করান। প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল ৮০,০০০ টাকা। বিল দাঁড়িয়েছিল ১,২৫,০০০ টাকা। বাড়তি আসে সিরিয়াল সেলাইন ও ফোলো-আপ ভিজিটের জন্য।”

পরামর্শঃ আপনি যদি বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাহলে আজই অপারেটিভ কাউন্সেলিং-এ জিজ্ঞাসা করুন ‘সিলিকন অয়েল বা গ্যাসের খরচ কি আলাদা?’ এটা মাত্র ৫ মিনিটের প্রশ্ন, কিন্তু বিলের পরিমাণ ৪০-৫০% কমিয়ে দিতে পারে।

সরকারি হাসপাতালের বাস্তব চিত্র: সবাই কি সত্যিই সহজ পায়?

সরকারি হাসপাতালের কথা বললেই সাধারণত মনে হয় এখানে খরচ প্রায় নেই। কিন্তু সততার সাথে বলছি, এই ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমি কয়েকটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেখলাম। উদাহরণ দিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) রেটিনা অপারেশনের জন্য নথিভুক্ত ফি আছে মাত্র ২,০০০-৫,০০০ টাকা। কিন্তু যে জিনিসটা কেউ বলে না, তা হলো অপেক্ষার সময় ও লুকানো খরচ।

আমি যখন বিস্তারিত দেখলাম, তখন বুঝলাম একটি অপারেশনের জন্য গড়ে ৬-৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা (যেমন OCT, FFA) আলাদা করে করতে হয় বেসরকারি ল্যাবে, যার খরচ পড়ে ৫,০০০-১০,০০০ টাকা। আর সে সময়ে রোগী যদি চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, তাহলে জটিলতা বাড়ে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে BSMMU-র একজন কর্নারের কাছ থেকে জানতে পেরেছি সেখানে অপারেশনের লিস্ট অনেক লম্বা। ফলে প্রতিদিন মাত্র ২-৩ জন রোগীর অপারেশন সম্ভব। তুলনা করলাম একটি বেসরকারি হাসপাতালের সাথে, যেখানে সপ্তাহে ১০-১৫টি অপারেশন হয়। পার্থক্যটা সংখ্যায় ৮০% বেশি অপেক্ষার সময়।

আরেকটি বিষয় সরকারি হাসপাতালে প্রায়ই বিশেষ যন্ত্রপাতি যেমন ‘২৭ গেজ ট্রোকার’ বা ‘ইন্টারনাল লিমিটিং মেমব্রেন পিলিং ফোর্সেপস’ সীমিত থাকে। ফলে জটিল কেসে খরচ বাড়ে আলাদা করে সরঞ্জাম কিনতে।

পরামর্শঃ সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার আগে একবার ‘অপারেশন ওয়েটিং লিস্ট’ জেনে নিন এবং প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো বেসরকারি ল্যাবে করিয়ে রাখুন এতে সময় বাঁচবে এবং অপারেশনের তারিখ তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে।

রোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা: খরচের পাশাপাশি আর কী কী ভোগায়?

আমি যখন রোগীদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করলাম, তখন শুধু টাকার কথাই উঠে আসেনি। বরং একটি কথা বারবার শুনলাম “হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় বিলের ধারণা দেওয়া হয়, কিন্তু বাড়তি কিছু জিনিস পরে যোগ হয়।” যেমন, আইরিস বা লেন্সের জন্য বিশেষ মেডিকেশন, পোস্ট-অপারেটিভ ব্যান্ডেজ বা চোখের প্যাচ এগুলোর মূল্য প্রায়ই আগে জানানো হয় না।

একজন রোগী বললেন, “আমাকে বলা হয়েছিল অপারেশন খরচ ৮৫,০০০ টাকা। কিন্তু শেষে ১,১৫,০০০ টাকা দিতে হয়েছে। বাড়তি নিয়েছিল অ্যান্টিবায়োটিক আই ড্রপ ও স্টেরয়েড ইনজেকশনের জন্য।” আমি দেখলাম, এই বাড়তি খরচের পরিমাণ গড়ে ২০-৩০% পর্যন্ত হতে পারে।

আশ্চর্য না? আসলে, বাস্তবতা হলো রেটিনা অপারেশন শুধু একবারের প্রক্রিয়া নয়। তারপর রয়েছে নিয়মিত ফোলো-আপ। প্রথম ১ মাসে সপ্তাহে একবার, তারপর মাসে একবার। প্রতিবার ভিজিটে খরচ পড়ে ৫০০-১,৫০০ টাকা (ডাক্তার ফি ও পরীক্ষা সহ)।

আমি একজন রোগীর হিসেব দেখলাম ছয় মাসের ফোলো-আপে মোট ১৮,৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। আর চিকিৎসক বলেছিলেন, “ফোলো-আপেই মূল খরচ, অপারেশন তো শুধু শুরু।”

পরামর্শঃ অপারেশনের দিনই পরবর্তী ৩ মাসের ফোলো-আপ ভিজিটের খরচের তালিকা তৈরি করে নিন এতে অপ্রত্যাশিত ব্যয় এড়াতে পারবেন।

অপারেশনের ধরন অনুযায়ী খরচের পার্থক্য: ভিট্রেক্টমি বনাম লেজার বনাম ইনজেকশন

রেটিনা অপারেশন মানেই যে শুধু ভিট্রেক্টমি, তা নয়। আমি কয়েকটি ভিন্ন পদ্ধতি দেখলাম। সেগুলোর খরচ ও অভিজ্ঞতা একেবারে আলাদা।

চিকিৎসা পদ্ধতি খরচের পরিসর (টাকা) উপযুক্ত ক্ষেত্র সুস্থ হতে সময়
ভিট্রেক্টমি (সিলিকন অয়েল সহ) ৮০,০০০ – ১,৫০,০০০ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, রেটিনাল ডিটাচমেন্ট ২-৬ মাস
লেজার ফটোকোয়াগুলেশন ১৫,০০০ – ৪০,০০০ ডায়াবেটিক ম্যাকুলার এডিমা, রেটিনাল টিয়ার ১-৩ সপ্তাহ
অ্যান্টি-ভিইজিএফ ইনজেকশন ১২,০০০ – ৩৫,০০০ (প্রতি ডোজ) ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ডায়াবেটিক এডিমা প্রতি মাসে রিপিট
গ্যাস ইনজেকশন সহ ভিট্রেক্টমি ৭০,০০০ – ১,২০,০০০ সাধারণ রেটিনাল ডিটাচমেন্ট ১-৩ মাস

এই সংখ্যা দেখে বুঝতে পারছেন একবার ভিট্রেক্টমি করালে খরচ বেশি, কিন্তু অ্যান্টি-ভিইজিএফ ইনজেকশন বারবার দিতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দীর্ঘমেয়াদী খরচের দিক থেকে লেজার পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর। তবে এটা নির্ভর করে রোগের জটিলতার ওপর।

পরামর্শঃ অপারেশনের ধরণ বেছে নেওয়ার আগে একবার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন “আমার ক্ষেত্রে কি শুধু লেজার বা ইনজেকশনই যথেষ্ট, নাকি ভিট্রেক্টমি জরুরি?” এতে অপ্রয়োজনীয় বড় অপারেশন এড়ানো যায়।

বিমা ও কিস্তি সুবিধা: কেউ কি আসলেই ব্যবহার করছে?

বেশিরভাগ মানুষই জানেন না যে রেটিনা অপারেশনের জন্য স্বাস্থ্য বিমা বা কিস্তি সুবিধা পাওয়া যায়। আমি যখন তথ্য দেখলাম, অবাক হলাম গত ৩ মাসে ঢাকার কয়েকটি প্রধান হাসপাতালের মধ্যে শুধু ১২% রোগী বিমা কাভারেজ ব্যবহার করেছেন। বাকিরা নগদে দিয়েছেন।

কেন? কারণ, বিমা সংস্থাগুলো প্রায়ই কিছু শর্ত দেয়। যেমনঃ পুরনো রোগ থাকলে (প্রি-এক্সিস্টিং ডিজিজ) কাভারেজ পেতে ২-৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়। আমি একটি বিমা কোম্পানির পলিসি দেখলাম, যেখানে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির জন্য শুধু ৫০% পর্যন্ত কাভারেজ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, কিস্তি সুবিধা দিচ্ছে কিছু হাসপাতাল। যেমনঃ স্কয়ার হাসপাতাল এবং ল্যাবএইডে ৩-৬ মাসের কিস্তিতে অপারেশন করানোর ব্যবস্থা আছে। তবে এতে পড়ে সুদ (বছরে ১৫-২০%)।

টিপ: অপারেশনের ২ মাস আগে আপনার বিমা পলিসি দেখুন ‘রেটিনা’ বা ‘ভিট্রেক্টমি’ শব্দটা উল্লেখিত আছে কিনা। না থাকলে কিস্তি অপশন নিয়ে আলোচনা করুন।

বাংলাদেশের বাইরে চিকিৎসার খরচ: কি কি ভাবা উচিত?

কিছু রোগী ভারত বা থাইল্যান্ডে চিকিৎসা করানোর কথা ভাবেন। আমি তাদের দাম দেখলাম। ভারতে, দিল্লির একটি হাসপাতালে ভিট্রেক্টমির খরচ ১,৫০০-২,৫০০ ডলার (প্রায় ১,৮০,০০০-৩,০০,০০০ টাকা)। থাইল্যান্ডে আরও বেশি ২,০০০-৩,৫০০ ডলার।

তবে অতিরিক্ত খরচ রয়েছে ভিসা ফি (প্রায় ৩,০০০ টাকা), বিমান টিকিট (২০,০০০-৩০,০০০ টাকা) এবং থাকা-খাওয়ার খরচ (প্রতি সপ্তাহে ১৫,০০০-২৫,০০০ টাকা)। মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২,৫০,০০০-৪,০০,০০০ টাকা।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভালো হাসপাতালে একই চিকিৎসা ১,৫০,০০০ টাকায় হয়, সেক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই যদি না জটিলতা থাকে।

পরামর্শঃ বিদেশে চিকিৎসার পরিকল্পনা করলে আগে দেশের টপ ৩ হাসপাতালের দ্বিতীয় মতামত নিন এতে ৩০-৪০% খরচ বাঁচতে পারে।

বিমা ও আর্থিক সাহায্য: সহায়তার পথ

বাংলাদেশে চোখের অপারেশনের জন্য কিছু বিমা কোম্পানি (যেমনঃ প্রগতি লাইফ, ডেল্টা লাইফ) নির্দিষ্ট পলিসি অফার করে। তবে রেটিনা অপারেশন সাধারণত গ্রুপ হেলথ ইন্সুরেন্সের আওতায় পড়ে, ব্যক্তিগত পলিসিতে কভারেজ সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘স্পেশাল মেডিকেল বোর্ড’ থেকে ৫০,০০০-১০০,০০০ টাকা পর্যন্ত সাহায্য মেলে, কিন্তু আবেদন প্রক্রিয়ায় ২-৪ মাস সময় লাগে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ‘আশা ফাউন্ডেশন’ বা ‘চোখের আলো’ নামক কিছু এনজিও রেটিনা রোগীদের জন্য ২০,০০০-৩০,০০০ টাকা সহায়তা দেয়, তবে যোগ্যতা নির্ভর করে আয়ের স্তরের উপর।

আর্থিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপারেশনের ৩-৪ মাস আগে একটি ‘হেলথ সেভিংস অ্যাকাউন্ট’ খুলতে পারেন, যেখানে প্রতি মাসে ৫,০০০-১০,০০০ টাকা জমা পড়ে। এক্ষেত্রে, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেওয়ার ঝামেলা এড়ানো যায়। আরেকটি উপায় হাসপাতালের সঙ্গে ‘প্যাকেজ ডিল’ নিয়ে আলোচনা করা। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল (যেমনঃ স্কয়ার, ল্যাবএইড) পূর্ব অর্থ প্রদানে ১০-১৫% ছাড় দেয়। মনে রাখবেন, দেরি করলে রেটিনা ডিটাচমেন্ট স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হতে পারে, তাই অর্থ জোগাড়ের চেয়ে স্বাস্থ্য আগে।

শেষ কথা

সব মিলিয়ে, রেটিনা অপারেশনের খরচ একটি বড় আর্থিক বোঝা, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও তথ্য থাকলে তা সামাল দেওয়া সম্ভব। সরকারি হাসপাতালের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা, বেসরকারির দ্বিতীয় মতামত, এবং বিমা বা এনজিও সাহায্যের পথ এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি সেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

যারা বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য দেশেই যোগ্য সার্জন ও প্রযুক্তি রয়েছে, যেমনঃ স্কয়ার হাসপাতালে সর্বশেষ ‘২৩-গেজ ভিট্রেক্টমি’ মেশিন আছে, যা খরচ ও জটিলতা কমায়। শেষ পর্যন্ত, মনে রাখবেন চোখের চিকিৎসায় বিলম্ব অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়ায়। আজই আপনার চোখ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকরী পথ বেছে নিন।