আমার ধারণা, এইচসিজি-র পর থেকেই চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে বাঙালির আতঙ্কটা কমেনি। কিন্ত সম্প্রতি যখন কিছু রোগীর বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে ডেটা ঘাঁটলাম, তখন চোখ কপালে উঠে গেল। শুধু হাসপাতালের বিল নয়, বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লুকিয়ে থাকা খরচের একটা পুরো তালিকা বেরিয়ে এসেছে। যেখানে মূত্রনালীর পাথর অপসারণ বা URSL-এর আসল চেহারা ফুটে উঠেছে।

শুরুটা যেভাবে: প্রাথমিক খরচের ধাক্কা

বেশিরভাগ রোগীই প্রথমে ফোনে খোঁজ নেয়। আমার দেখা একটি কেস একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি, নাম বলব না, নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ফোন করে জানতে পারেন অপারেশনের খরচ ৪৫ হাজার টাকা থেকে শুরু। কিন্ত যখন সরাসরি গেলেন, তখন আবিষ্কার করলেন উরোলজিস্টের পরামর্শ ফি, আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান সব মিলিয়ে আগেই ৮-১০ হাজার টাকা উড়ে গেছে।

সত্যি বলতে, বেশিরভাগ ফোনালাপে বেসরকারি হাসপাতালগুলো বেস প্যাকেজ বলে। কিন্তু আসল খরচ বের হয় যখন আপনি ডাক্তারের চেম্বারে বসেন। কেউ কেউ জানালেন, রাজধানীর ল্যাবএইড বা এভারকেয়ারে সিটি কে+ইউবি স্ক্যান করতে লেগেছে ৫-৬ হাজার টাকা। আর কেউ কেউ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেমন, ঢাকা মেডিকেলের কথা বললে শুনিনি সিটি স্ক্যানের জন্য ৩-৪ হাজার টাকা লাগে, তবে সময় লাগে সপ্তাহখানেক।

খরচের ধাপ বেসরকারি হাসপাতাল (টাকা) সরকারি প্রতিষ্ঠান (টাকা)
ডাক্তার পরামর্শ ফি ১০০০-২০০০ ২০০-৫০০
সিটি কে+ইউবি স্ক্যান ৫,০০০-৭,০০০ ৩,০০০-৪,০০০
রক্ত/প্রস্রাব পরীক্ষা ১,৫০০-৩,০০০ ৫০০-১,০০০

একটি কার্যকরী টিপ: আজই বাসায় বসে কাছের সরকারি হাসপাতালের ওয়েবসাইট বা হেল্পলাইন থেকে সিটি স্ক্যানের মূল্য জেনে নিন। মাত্র 10 মিনিটের কাজ।

অপারেশন বিলের ভেতরটা: ঠিক কী কী জিনিস লুকিয়ে থাকে?

আপনি যখন URSL-এর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হবেন, প্যাকেজ মূল্যটা সাধারণত ৩০-৮০ হাজার টাকার মধ্যে থাকে। কিন্তু ইদানীং একাধিক রোগীর অভিজ্ঞতা মিলিয়ে যা বুঝলাম, সেটা হলো অনেকেই অবাক হন যখন দেখেন বিলে ‘অপারেশন থিয়েটার ফি’ আলাদা, ‘এনেস্থেশিয়া ফি’ আলাদা, ‘মেডিসিন ফি’ আলাদা। একজনের কাছে প্যাকেজ ছিল ৫০ হাজার, অথচ শেষ বিল ৭২ হাজার। কারণ কী? জেনারেল এনেস্থেশিয়ার জন্য আলাদা করে একজন ডাক্তার রাখার খরচ, অ্যান্টিবায়োটিকের পাঁচ-ছয় ডোজ, আর প্রি-অপারেটিভ বুক এক্স-রে এগুলো প্যাকেজের বাইরে।

বেশি অবাক লাগলো যখন গত ফেব্রুয়ারিতে এক রোগীর খরচ তালিকার দিকে তাকালাম। তাঁর রাজধানীর একটি নামজাদা হাসপাতালে লেজার ফাইবারের জন্য ১২ হাজার টাকা জমা দিতে হয়েছিল। ‘কিস্তিমাত’ শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম, কিন্তু পরে বুঝলাম এটা পুরনো তথ্য নয়, বর্তমান সময়ের। কেউ কেউ বলেন, লেজার ফাইবার একবার ব্যবহারযোগ্য, তাই এটা প্যাকেজে থাকে না। তবে কিছু হাসপাতাল এটাও বান্ডেল করে রাখে।

আপনি কি জানেন, কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন: ঢাকা মেডিকেল বা সিএমএইচ-এ অপারেশনে লেজার ফাইবারের খরচ নেয় না? লাগে শুধু ১০০-২০০ টাকা সার্জারি ফি। কিন্তু সময় লাগে লিস্টে নাম উঠতে ২-৩ মাস। রাতারাতি সমাধান চাইলে বেসরকারি হাসপাতালই একমাত্র পথ।

আমার সহজ নিয়ম: অপারেশন প্যাকেজ নেওয়ার আগে ‘কী কী কাভার করছে’ সেটা লিখিতভাবে জেনে নিন। মাত্র ৫ মিনিটের ওই সময়টা হাজার হাজার টাকা বাঁচাতে পারে।

রোগীর পকেটে সবচেয়ে বেশি ফাঁক ফেলার জায়গা: অনুমোদনহীন খরচ

আমার চেয়ে বড় একটি পর্যবেক্ষণ হলো বেশিরভাগ রোগীই হঠাৎ করেই মুখোমুখি হন ‘অন্যান্য খরচ’ নামের একটা তালিকার। যেমন পাথর অপসারণের পর যখন ক্যাথেটার বা স্টেন্ট বসানো হয়, তখন তার দাম লিখিতভাবে আগে জানানো হয় না। সম্প্রতি এক রোগী জানালেন, একটি ব্র্যান্ডের ডাবল-জে স্টেন্ট বসাতে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। অথচ অন্য জায়গায় সেটা পাওয়া যায় ৭-৮ হাজারে। পার্থক্যটা কোথায়? একই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখায় দাম আলাদা।

এখন প্রশ্ন, কীভাবে বাঁচবেন? কয়েকটি উৎস থেকে জানলাম যেমন ইব্রাহিম কার্ডিয়াক বা মিটফোর্ডে এই ধরনের স্টেন্ট বসানোর খরচ ৮-১০ হাজার টাকা। কিন্তু অবশ্যই সার্জিক্যাল গ্রেডের নাম ও কোম্পানি মাথায় রাখবেন। সততার সাথে বলছি, আমি এ নিয়ে নিজেও দ্বিধায় আছি কোন স্টেন্ট দীর্ঘমেয়াদে ভালো, তা নিয়ে ডেটা তো আছে, কিন্তু বাজারে প্রতি মাসেই নতুন কিছু ঢুকছে।

এছাড়াও খরচের তালিকায় যোগ হয় অপারেশনের পরের দিনের বেড ফি (সিঙ্গেল কেবিন হলে ২,০০০-৪,০০০ হাজার প্রতিদিন), নার্সিং চার্জ, ওষুধের খরচ। এক মাসের রুটিনে এসব মিলিয়ে গড়ে ৪০ হাজার বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত খরচ পড়তে পারে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেটা অর্ধেকেরও কম। তবে সেখানে অপেক্ষার পালা শেষ নেই।

সাধারণ খরচের আইটেম বেসরকারি (টাকা) সরকারি (টাকা)
ডাবল-জে স্টেন্ট ১০,০০০-১৫,০০০ ৮,০০০-১০,০০০
ক্যাথেটার সেট ২,০০০-৫,০০০ ৫০০-১,৫০০
পোস্ট-অপ ওষুধ (১৫ দিন) ৩,০০০-৫,০০০ ১,০০০-২,০০০

যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে: হাসপাতালে ভর্তির আগে চারপাশে খোঁজ নিন যে স্টেন্টের বাজারদর কেমন। এখুনি আপনার মোবাইলে সার্জিক্যাল আইটেমের মূল্য তালিকা সেভ করে নিন এটা মাত্র ৫ মিনিটের প্রস্তুতি।

বিভিন্ন হাসপাতাল ও শহরের মধ্যে তুলনা: কোথায় সাশ্রয়?

আমি গত কয়েক মাসের ডেটা নিয়ে বসে দেখলাম, শুধু ঢাকা শহরেই একেক হাসপাতালের খরচের ব্যবধান হাজার হাজার টাকা। যেমনঃ পপুলার মেডিকেল কলেজে URSL প্যাকেজ শুরু ৪৫ হাজার। অথচ স্কয়ার হাসপাতালে সেটা ৭০ হাজার থেকে শুরু। কিন্তু স্কয়ারের ক্ষেত্রে ইন্টারনাল মেডিসিন ও লেজারের মান নিয়ে অনেকে সন্তুষ্ট থাকলেও দামটা অনেকের জন্য অসুবিধাজনক।

এদিকে বাইরের জেলা যেমনঃ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ বা সিলেট ওসমানী সেখানে অপারেশনের খরচ মাত্র ২০-২৫ হাজার টাকা। কিন্তু সেখানে রোগী বা পরিচিতজন থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ। যদি জানতে চান, কেউ কেউ চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ৩৮ হাজার টাকায় URSL করিয়েছেন। কি বলবেন? সত্যি কথা, খরচ কমের পেছনে আরেকটা কারণ লেজার ফাইবার বা স্টেন্টের কম দাম। কিন্তু সেটা সবসময় রোগীকে বোঝানো হয় না।

একটা জিনিস স্পষ্ট, বড় শহর কেন্দ্রিক সবসময় দাম বেশি নয়। কেউ কেউ বলেন, ঢাকার বাইরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভাব তাই সেখানে পাথরের বড় অপারেশনের ব্যবস্থা নিতে গেলে খরচ বাড়ে। কিন্তু আমি যখন দেখলাম ঢাকার একটি হাসপাতালে খরচ ৮০ হাজার, আর খুলনার সিটি মেডিকেলে ৪৫ হাজার তখন বুঝলাম শুধু ডাক্তারই নন, হাসপাতালের ‘বিরান্ডা’ ও ‘ব্র্যান্ডিং’-ও দামে প্রভাব ফেলে।

একটি পরামর্শ: আপনি যদি মফস্বলে থাকেন, তাহলে স্থানীয় জেলা সদর হাসপাতাল থেকে URSL-এর জন্য উরোলজিস্টের তালিকা সংগ্রহ করে নিন। এই তালিকা বানানো মাত্র এক ঘণ্টার কাজ।

চিকিৎসার পরেও যে খরচগুলো ভুললে চলবে না

অপারেশন শেষ এটা শেষ নয়। অনেকেই ভুলে যান যে পাথর অপসারণের পরেও প্রতি মিনিট খরচ হয়। যেমন, ডাবল-জে স্টেন্ট বের করার জন্য আবার একটা ছোট অপারেশন দরকার পায়। সাধারণত সেটা সিস্টোস্কোপি নামে পরিচিত। আর সেই খরচ ১০-১৫ হাজার টাকা। কেউ কেউ মনে করেন প্রথম প্যাকেজেই সব শেষ: সত্যিই সেটা নয়।

একটি কেস ডেটায় পেলাম এক রোগীর ৪ মাস পর স্টেন্ট বের করতে গিয়ে সংক্রমণ হওয়ায় আরও ২০ হাজার খরচ হয়েছে। এই জিনিসগুলো বলতে চাই কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা তো সেটাই ফুটিয়ে তোলে। ঠিক আছে, এটা নিয়ে আমার মাথায় আরেকটা চিন্তা আসে আপনি যদি সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ চিকিৎসা করান, তাহলে স্টেন্ট বের করতে কোন খরচ হয় না। কিন্তু সময় ও ভোগান্তি সেটা আর বলে দেওয়ার নয়।

তবে আরেকটি দিক অপারেশনের পরের পুষ্টি ও ওষুধে খরচ। উদাহরণস্বরূপ, লেবু-পানি, ফলমূল, নিম্ন-সোডিয়াম খাবার এগুলোর জন্য আলাদা টাকা। একটা সময় আমি ভাবতাম এগুলো ফালতু খরচ। কিন্তু সম্প্রতি একটি ডায়েবেটিস রোগীর অভিজ্ঞতা দেখে বুঝলাম সঠিক খাদ্যাভ্যাস না মানলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাহলে খরচটা বৈধ। আর তাই, পরামর্শ দিচ্ছি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন পরবর্তী এক মাসের খরচ কেমন হবে।

নিজের জন্য করে ফেলুন: আজকেই আপনার ফোনে পোস্ট-অপের ১৫ দিনের ওষুধের তালিকা তৈরি করুন ও সেগুলোর বাজারদর মিলিয়ে নিন। এই কাজটা মাত্র ৩০ মিনিটের।

শেষ কথা

সার্চ ও বিশ্লেষণ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার মূত্রনালীর পাথর অপসারণের খরচ শুধু অপারেশন থিয়েটারের দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা একাধিক স্তর এই ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। আমার একটাই কথা যেকোনো চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে লিখিত খরচের তালিকা চান, আর সরকারি ও বেসরকারি বিকল্পগুলো নিজের পায়ে হেঁটে মিলিয়ে দেখুন।

আপনার যদি এইমাত্র অপারেশন হয় বা করানোর কথা শুনছেন, তাহলে আজ থেকেই ওই হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ খরচের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংগ্রহ করে ফেলুন। তাতেই বাঁচবে অনেক হাজার হাজার টাকা।

এখন সরাসরি একটি হিসাব দেই ঢাকার একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে ইউরেটেরোস্কোপি ও লেজার ট্রিটমেন্টের বর্তমান খরচ প্রায় ৪৫ হাজার টাকা থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালে একই অপারেশন মাত্র ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় সম্ভব। কিন্তু সেখানে অপারেশনের জন্য গড়ে ৩ থেকে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়টুকু যদি রোগীর ব্যথা সহনীয় হয়, তাহলে সরকারি হাসপাতালই সেরা পছন্দ। কিন্তু জরুরি অবস্থায় বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া উপায় নেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাথরের আকার ও অবস্থানের ভিত্তিতে খরচ পরিবর্তিত হয়। ১ সেন্টিমিটারের কম পাথরের জন্য লেজার ট্রিটমেন্ট খরচ ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু ২ সেন্টিমিটারের বেশি পাথর হলে পিসিএনএল (পারকিউটেনিয়াস নেফ্রোলিথোটমি) করতে হয়, যার খরচ ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। তাই রোগীর পাথরের সাইজ আগেই জেনে নেওয়া জরুরি।

আজকাল অনেক পকেটে স্বাস্থ্য বীমা আছে। কিন্তু মূত্রনালীর পাথর অপসারণের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বীমা কোম্পানি অপারেশন খরচের ৭০% থেকে ৮০% মেটায়। তবে বাকি ২০-৩০% টাকা আগে থেকে জমা রাখা ভালো। মাত্র গত মাসে আমার এক বন্ধুকে ১৫ হাজার টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে হয়েছে বীমার কভারেজের বাইরে থাকা ওষুধ ও পরীক্ষার জন্য।

একটি বাস্তব উদাহরণ দেই গাজীপুরের এক রোগী তার ৬০ হাজার টাকার অপারেশনের পর ১২ হাজার টাকার ওষুধ কিনেছেন। ডাক্তার বলেছিলেন “সাধারণ ওষুধ”, কিন্তু ফার্মেসিতে গিয়ে দেখা গেল প্রতিটি ট্যাবলেট ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। তাই আগেভাগে জেনেরিক ওষুধের তালিকা তৈরি করে নিলে এই খরচ অর্ধেক করা সম্ভব।